ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে জার্মানি অন্যতম সফল এবং শক্তিশালী দল। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এই দলটি ফুটবল জগতে তাদের কৌশলগত দক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং ধারাবাহিকতার জন্য সুপরিচিত। জার্মানি মোট ৪ বার বিশ্বকাপ জয়লাভ করেছে – ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ এবং ২০১৪ সালে। ইতালির সাথে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ বিজয়ী দেশ হিসেবে জার্মানি ফুটবল ইতিহাসে নিজেদের স্থান পাকাপোক্ত করে নিয়েছে। খেলা টাইমের আজকের এই নিবন্ধে আমরা জানাব জার্মানি কত সালে কাপ জিতেছে ।
জার্মানির প্রথম বিশ্বকাপ ১৯৫৪
জার্মানির প্রথম বিশ্বকাপ জয় এসেছিল ১৯৫৪ সালে সুইজারল্যান্ডে। এই জয়টি “বার্নের অলৌকিক ঘটনা” নামে পরিচিত। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানি তৎকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ দল হাঙ্গেরিকে ৩-২ গোলে পরাজিত করে। হাঙ্গেরির “গোল্ডেন টিম” ৩১টি ম্যাচে অপরাজিত ছিল এবং গ্রুপ পর্বে জার্মানিকে ৮-৩ গোলে হারিয়েছিল। কিন্তু ফাইনালে ম্যাক্স মর্লক এবং হেলমুট রাহনের (২) গোলে জার্মানি অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাত্র নয় বছর পর এই বিজয় জার্মান জাতির জন্য আত্মবিশ্বাস এবং নতুন শুরুর প্রতীক হয়ে ওঠে।
| বিষয় | বিবরণ |
| তারিখ | ৪ জুলাই, ১৯৫৪ |
| ভেন্যু | ওয়াঙ্কডর্ফ স্টেডিয়াম, বার্ন (সুইজারল্যান্ড) |
| বিপক্ষ দল | হাঙ্গেরি (সেই সময়ের অপ্রতিরোধ্য ‘ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স’) |
| ফলাফল | পশ্চিম জার্মানি ৩ – ২ হাঙ্গেরি |
| জার্মানির গোলদাতা | ম্যাক্স মরলক (১০’), হেলমুট রান (১৮’, ৮৪’) |
জার্মানির দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ১৯৭৪
স্বাগতিক হিসেবে পশ্চিম জার্মানি ১৯৭৪ সালে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে নেয়। মিউনিখে অনুষ্ঠিত ফাইনালে “টোটাল ফুটবল” খেলা নেদারল্যান্ডসকে ২-১ গোলে পরাজিত করে জার্মানি। ইয়োহান ক্রুইফের ডাচ দল প্রথম মিনিটেই এগিয়ে গেলেও পল ব্রেইটনার সমতা করেন এবং কিংবদন্তি গার্ড মুলার বিজয়ী গোল করেন। ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের নেতৃত্বে জার্মানি কৌশলগত পরিপক্কতা এবং শক্তিশালী রক্ষণভাগের পরিচয় দেয়। মুলারের এই টুর্নামেন্টে মোট ১৪টি বিশ্বকাপ গোল ছিল, যা এখনও পর্যন্ত রেকর্ড হয়ে আছে।
| বিষয় | তথ্য |
| সাল | ১৯৭৪ |
| স্বাগতিক দেশ | পশ্চিম জার্মানি |
| ফাইনাল খেলার তারিখ | ৭ জুলাই, ১৯৭৪ |
| ভেন্যু | অলিম্পিয়াস্টাডিয়ন, মিউনিখ |
| বিজয়ী দল | পশ্চিম জার্মানি (২য় শিরোপা) |
| রানার্স-আপ | নেদারল্যান্ডস |
| ফাইনাল ফলাফল | ২-১ গোল |
জার্মানির তৃতীয় বিশ্বকাপ ১৯৯০
১৯৯০ সালে ইতালিতে পশ্চিম জার্মানি তৃতীয়বার শিরোপা জয় করে। রোমে ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হয়। আন্দ্রেয়াস ব্রেহমের পেনাল্টি গোলে জার্মানি ১৯৮৬ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়। এটি ছিল পশ্চিম জার্মানির শেষ বিশ্বকাপ, কারণ কয়েক মাস পরেই জার্মানির পুনঃএকত্রীকরণ হয়। লোথার ম্যাথাউসের নেতৃত্বে জার্মানি পরপর তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে (১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯০) পৌঁছানোর কীর্তি গড়ে। ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার কোচ হিসেবে এবং খেলোয়াড় উভয় হিসেবে বিশ্বকাপ জেতা তিনজনের একজন হন।
| বিষয় | বিবরণ |
| ফাইনালের তারিখ | ৮ জুলাই, ১৯৯০ |
| ভেন্যু | স্তাদিও অলিম্পিকো, রোম (ইতালি) |
| প্রতিপক্ষ | আর্জেন্টিনা |
| ফলাফল | ১-০ (পশ্চিম জার্মানি জয়ী) |
| একমাত্র গোলদাতা | আন্দ্রেয়াস ব্রেহমে (৮৫ মিনিটে, পেনাল্টি থেকে) |
| শিরোপা সংখ্যা | তৃতীয় (১৯৫৪ ও ১৯৭৪ এর পর) |
জার্মানির চতুর্থ বিশ্বকাপ ২০১৪
২০১৪ সালে ব্রাজিলে জার্মানি একীভূত জার্মানি হিসেবে প্রথমবার এবং সামগ্রিকভাবে চতুর্থবার বিশ্বকাপ জিতে নেয়। ইয়োয়াকিম লো-এর নেতৃত্বে জার্মানি অসাধারণ ফুটবল প্রদর্শন করে। সেমিফাইনালে স্বাগতিক ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে পরাজিত করে জার্মানি, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে চমকপ্রদ ম্যাচ। মাত্র ২৯ মিনিটে পাঁচটি গোল করে জার্মানি। মিরোস্লাভ ক্লোসা এই সেমিফাইনালে গোল করে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১৬ গোল) হওয়ার রেকর্ড গড়েন।
ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ে মারিও গটসের গোলে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হয়। এই বিজয়ের মাধ্যমে জার্মানি প্রথম ইউরোপীয় দল হিসেবে আমেরিকা মহাদেশে বিশ্বকাপ জিতে নেয়।
| ক্যাটাগরি | বিবরণ |
| তারিখ | ৮ জুলাই, ২০১৪ |
| ভেন্যু | এস্তাদিও মিনেইরাও, বেলো হরিজন্তে, ব্রাজিল |
| ফলাফল | জার্মানি ৭ – ১ ব্রাজিল |
| বিরতির ফলাফল | ৫ – ০ (জার্মানি এগিয়ে ছিল) |
| গোলদাতা (জার্মানি) | টমাস মুলার, মিরোস্লাভ ক্লোসা, টনি ক্রুস (২), সামি খেদিরা, আন্দ্রে শুরলে (২) |
| গোলদাতা (ব্রাজিল) | অস্কার (৯০ মিনিটে সান্ত্বনাসূচক গোল) |
জার্মানির বিশ্বকাপ পরিসংখ্যান
| অর্জন | সংখ্যা | বছরসমূহ |
| চ্যাম্পিয়ন | ৪ বার | ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০, ২০১৪ |
| রানার্স-আপ | ৪ বার | ১৯৬৬, ১৯৮২, ১৯৮৬, ২০০২ |
| তৃতীয় স্থান | ৪ বার | ১৯৩৪, ১৯৭০, ২০০৬, ২০১০ |
| চতুর্থ স্থান | ১ বার | ১৯৫৮ |
কিংবদন্তি খেলোয়াড়
মিরোস্লাভ ক্লোসা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা, মোট ১৬টি গোল নিয়ে। গার্ড মুলার ১৪টি গোল করেছিলেন যা দীর্ঘদিন রেকর্ড ছিল। ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার খেলোয়াড় এবং কোচ উভয় হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন। লোথার ম্যাথাউস দীর্ঘদিন সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলার রেকর্ড (২৫টি) ধারণ করেছিলেন।
জার্মান ফুটবলের বৈশিষ্ট্য
জার্মান ফুটবলের মূল বৈশিষ্ট্য হল কৌশলগত শৃঙ্খলা, শক্তিশালী রক্ষণভাগ এবং দলগত খেলা। তারা প্রতিটি যুগে নিজেদের খেলার ধরন পরিবর্তন করে আধুনিক ফুটবলের সাথে তাল মিলিয়েছে। তাদের “Mannschaftsgeist” বা দলীয় চেতনা বিশ্বখ্যাত। জার্মানি বিশ্বাস করে যে একটি সংগঠিত দল ১১ জন তারকার চেয়ে শক্তিশালী।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ
২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপে জার্মানি গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে, যা হতাশাজনক ছিল। তবে তাদের শক্তিশালী ফুটবল কাঠামো এবং যুব একাডেমি থেকে ক্রমাগত প্রতিভাবান খেলোয়াড় বের হচ্ছে। জামাল মুসিয়ালা, ফ্লোরিয়ান ভির্তস এবং কাই হাভার্টজের মতো তরুণ তারকারা জার্মান ফুটবলের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। তারা ২০২৬ বিশ্বকাপে আবার শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে প্রস্তুত হচ্ছে।
উপসংহার
জার্মানি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে ধারাবাহিক এবং সফল দলগুলির একটি। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, আটবারের ফাইনালিস্ট এবং তেরবারের সেমিফাইনালিস্ট হিসেবে তাদের রেকর্ড অতুলনীয়। ফুটবল বিশ্বে জার্মানি একটি মহান শক্তি হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


