ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার নেইমার দা সিলভা সান্তোস জুনিয়র বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল এবং জনপ্রিয় খেলোয়াড়। তিনি পেলের রেকর্ড ভেঙে ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন ৭৯ গোল করে। নেইমার ১৭ বছরের পেশাদার ক্যারিয়ারে সান্তোস, বার্সেলোনা এবং প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনে খেলে মোট ৩০টিরও বেশি ট্রফি জিতেছেন। তিনি দুটি মহাদেশীয় শিরোপা – কোপা লিবার্তাদোরেস এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ উভয়ই জিতেছেন, যা অত্যন্ত বিরল অর্জন। এছাড়াও ২০১৬ রিও অলিম্পিকে ব্রাজিলকে প্রথমবারের মতো ফুটবলে স্বর্ণপদক এনে দিয়ে জাতীয় বীরে পরিণত হন।
সান্তোসে জেতা ট্রফিগুলো (২০০৯-২০১৩)
নেইমার মাত্র ১৭ বছর বয়সে ২০০৯ সালে সান্তোসের যুব দলে যোগ দেন এবং দ্রুত প্রথম দলে জায়গা করে নেন। ২০১০ সালে ১৮ বছর বয়সে তিনি ক্যাম্পেওনাতো পাউলিস্তা চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার প্রতিভা এবং দক্ষতা দ্রুত তাকে ব্রাজিলের সবচেয়ে আলোচিত তরুণ খেলোয়াড়ে পরিণত করে।
| ট্রফির নাম | সংখ্যা | জয়ের বছর | বিশেষ অর্জন |
|---|---|---|---|
| ক্যাম্পেওনাতো পাউলিস্তা | ৩টি | ২০১০, ২০১১, ২০১২ | ১৯৬০ দশকের পর প্রথম হ্যাটট্রিক |
| কোপা দো ব্রাজিল | ১টি | ২০১০ | টুর্নামেন্টের শীর্ষ গোলদাতা |
| কোপা লিবার্তাদোরেস | ১টি | ২০১১ | টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় |
| রেকোপা সুদামেরিকানা | ১টি | ২০১২ | দক্ষিণ আমেরিকার সুপার কাপ |
| সান্তোসে মোট ট্রফি | ৬টি | ২০০৯-২০১৩ | ১৩৬ ম্যাচে ৭০ গোল |
২০১১ সালের কোপা লিবার্তাদোরেস জয় ছিল নেইমারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ফাইনালে উরুগুয়ের পেনারোলের বিরুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ গোল করেন এবং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। সান্তোস ৪৮ বছর পর এই মর্যাদাপূর্ণ দক্ষিণ আমেরিকান ট্রফি জিতেছিল এবং নেইমার ছিলেন তাদের প্রধান নায়ক।
বার্সেলোনায় জেতা ট্রফিগুলো (২০১৩-২০১৭)
২০১৩ সালে প্রায় ৫৭ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বার্সেলোনায় যোগদান করেন নেইমার। সেখানে তিনি লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেজের সাথে মিলে MSN ত্রয়ী গঠন করেন যা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী আক্রমণভাগ হিসেবে পরিচিত। তিনটি মৌসুমে এই ত্রয়ী ৩৬৪টি গোল করে।
| ট্রফির নাম | সংখ্যা | জয়ের বছর | বিশেষত্ব |
|---|---|---|---|
| লা লিগা | ২টি | ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ | MSN ত্রয়ী যুগের আধিপত্য |
| কোপা দেল রে | ৩টি | ২০১৫, ২০১৬, ২০১৭ | টানা তিন বছর চ্যাম্পিয়ন |
| উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ | ১টি | ২০১৫ | যৌথ শীর্ষ গোলদাতা (১০ গোল) |
| সুপারকোপা দে এসপানিয়া | ২টি | ২০১৩, ২০১৬ | স্পেনের সুপার কাপ |
| উয়েফা সুপার কাপ | ১টি | ২০১৫ | সেভিয়ার বিপক্ষে জয় |
| ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ | ১টি | ২০১৫ | ট্রেবল জয়ের বছর |
| বার্সেলোনায় মোট | ১০টি | ২০১৩-২০১৭ | ১৮৬ ম্যাচে ১০৫ গোল |
২০১৪-১৫ মৌসুমে নেইমার সব প্রতিযোগিতায় মিলিয়ে ৪৩ গোল করেন এবং বার্সেলোনার ঐতিহাসিক ট্রেবল (লা লিগা, কোপা দেল রে এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) জয়ে মূল ভূমিকা রাখেন। বার্লিনে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে জুভেন্টাসের বিরুদ্ধে তিনি গোল করেন। সেই বছর তিনি ব্যালন ডি’অর ভোটে মেসি-রোনালদোর পরে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন।
পিএসজি-তে জেতা ট্রফিগুলো (২০১৭-২০২৩)
২০১৭ সালের আগস্টে নেইমার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ট্রান্সফারে ২২২ মিলিয়ন ইউরোতে প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনে যোগদান করেন। পরবর্তী ছয় বছরে তিনি ফরাসি ফুটবলে সম্পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করেন। যদিও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা হয়নি, তবে ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় তার সাফল্য অসামান্য।
| ট্রফির নাম | সংখ্যা | জয়ের বছর | পরিসংখ্যান |
|---|---|---|---|
| লিগ ১ | ৫টি | ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯, ২০১৯-২০, ২০২১-২২, ২০২২-২৩ | পরপর পাঁচ বার চ্যাম্পিয়ন |
| কুপ দ্য ফ্রান্স | ৩টি | ২০১৮, ২০২০, ২০২১ | ফ্রান্সের এফএ কাপ |
| কুপ দ্য লা লিগ | ২টি | ২০১৮, ২০২০ | ফ্রেঞ্চ লিগ কাপ |
| ট্রফি দে শাম্পিওঁ | ৪টি | ২০১৮, ২০১৯, ২০২০, ২০২২ | ফ্রেঞ্চ সুপার কাপ |
| PSG-তে মোট | ১৪টি | ২০১৭-২০২৩ | ১৭৩ ম্যাচে ১১৮ গোল + ৭৯ অ্যাসিস্ট |
PSG-তে নেইমারের পরিসংখ্যান অসাধারণ। তিনি প্রতি ম্যাচে গড়ে ১.১৪টি গোল-জড়িত (গোল + অ্যাসিস্ট) ছিলেন। ২০১৯-২০ মৌসুমে কোভিড মহামারীর মধ্যে লিসবনে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্স-আপ হয়েছিলেন। এটিই তার পিএসজি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কাছাকাছি মুহূর্ত ছিল চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার।
ব্রাজিল জাতীয় দলের ট্রফি ও অর্জন
নেইমার ২০১০ সাল থেকে ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন এবং ১২৮টি ম্যাচে ৭৯ গোল করে পেলের ৭৭ গোলের রেকর্ড ভেঙে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। তিনি ব্রাজিলের জন্য দুটি বড় ট্রফি জিতেছেন।
| ট্রফির নাম | জয়ের বছর | বিশেষত্ব |
|---|---|---|
| অলিম্পিক স্বর্ণপদক | ২০১৬ | ব্রাজিলের ফুটবলে প্রথম অলিম্পিক স্বর্ণ |
| কনফেডারেশন কাপ | ২০১৩ | টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় (এমভিপি) |
| জাতীয় দলে মোট | ২টি | ১২৮ ম্যাচে ৭৯ গোল (ব্রাজিলের রেকর্ড) |
২০১৬ রিও অলিম্পিকের ফাইনাল ছিল নেইমারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগময় মুহূর্ত। মারাকানা স্টেডিয়ামে নিজের দেশে জার্মানির বিরুদ্ধে পেনাল্টি শুটআউটে সিদ্ধান্তকারী গোল করে দেশকে প্রথম অলিম্পিক স্বর্ণপদক এনে দেন। সেই মুহূর্তে কান্নায় ভেঙে পড়েন নেইমার।
ব্যক্তিগত পুরস্কার ও সম্মাননা
নেইমার তার ক্যারিয়ারে অসংখ্য ব্যক্তিগত পুরস্কার এবং সম্মাননা অর্জন করেছেন যা তার প্রতিভা এবং দক্ষতার প্রমাণ।
| পুরস্কার | বছর/সংখ্যা | বিবরণ |
|---|---|---|
| ফিফা পুস্কাস অ্যাওয়ার্ড | ২০১১ | বছরের সেরা গোল (সান্তোসের হয়ে ফ্লামেঙ্গোর বিপক্ষে) |
| লিগ ১ প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার | ২০১৮ | পিএসজি-তে প্রথম পূর্ণ মৌসুমে |
| উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টিম অফ দ্য সিজন | ৩ বার | ২০১৫, ২০১৭, ২০২০ |
| সাম্বা গোল্ড (ব্রাজিলের সেরা খেলোয়াড়) | ২ বার | ২০১১, ২০১৪ |
| কোপা লিবার্তাদোরেস সেরা খেলোয়াড় | ২০১১ | সান্তোসের সাথে চ্যাম্পিয়ন হয়ে |
| অলিম্পিক ব্রোঞ্জ বুট | ২০১৬ | রিও অলিম্পিকে তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা |
| ব্যালন ডি’অর (৩য় স্থান) | ২০১৫, ২০১৭ | মেসি-রোনালদোর পরে পডিয়ামে |
| কনফেডারেশন কাপ এমভিপি | ২০১৩ | ব্রাজিলের সাথে চ্যাম্পিয়ন হয়ে |
| দক্ষিণ আমেরিকার বর্ষসেরা খেলোয়াড় | ২০১১, ২০১২ | পরপর দুই বছর |
| ফিফপ্রো ওয়ার্ল্ড একাদশ | ২০১৫, ২০১৭ | বিশ্বের সেরা একাদশে |
| চ্যাম্পিয়ন্স লিগ যৌথ শীর্ষ গোলদাতা | ২০১৪-১৫ | ১০ গোল |
মোট বড় ট্রফি বিভাজন – ২০২৬ আপডেট
এখানে নেইমারের সম্পূর্ণ ক্যারিয়ারের ট্রফি সংখ্যা একনজরে দেখুন:
| ক্লাব/দল | ট্রফি সংখ্যা | প্রধান ট্রফি | মেয়াদকাল | মোট গোল |
|---|---|---|---|---|
| সান্তোস (ব্রাজিল) | ৬টি | লিবার্তাদোরেস, পাউলিস্তা (৩), কোপা দো ব্রাজিল | ২০০৯-২০১৩ | ৭০ |
| বার্সেলোনা (স্পেন) | ১০টি | চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লা লিগা (২), কোপা দেল রে (৩) | ২০১৩-২০১৭ | ১০৫ |
| PSG (ফ্রান্স) | ১৪টি | লিগ ১ (৫), কুপ দ্য ফ্রান্স (৩), সুপার কাপ (৪) | ২০১৭-২০২৩ | ১১৮ |
| ব্রাজিল জাতীয় দল | ২টি | অলিম্পিক স্বর্ণ (২০১৬), কনফেডারেশন কাপ (২০১৩) | ২০১০-বর্তমান | ৭৯ |
| সর্বমোট ট্রফি | ৩২টি | ২১টি ইউরোপে, ৭টি দক্ষিণ আমেরিকায় | ২০০৯-২০২৬ | ৩৭২+ |
মূল পরিসংখ্যান সারসংক্ষেপ:
বিশেষ অর্জন ও রেকর্ডসমূহ
নেইমারের কিছু বিশেষ অর্জন যা তাকে অনন্য করে তুলেছে তা হলো তিনি তিনটি ভিন্ন ক্লাবে ১০০+ গোল করেছেন (সান্তোস ৭০, বার্সা ১০৫, PSG ১১৮)। দুই মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন – কোপা লিবার্তাদোরেস এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা (৭৯ গোল)। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল খেলোয়াড় (২২২ মিলিয়ন ইউরো)। । ক্যারিয়ার গোল+অ্যাসিস্ট ৬৬৫+ অতিক্রম করেছেন।
আল-হিলাল ও সান্তোসে ফিরে আসা
২০২৩ সালে সৌদি আরবের আল-হিলালে যোগ দিলেও ACL ইনজুরির কারণে মাত্র ৭টি ম্যাচ খেলতে পারেন এবং কোনো ট্রফি জিততে পারেননি। দীর্ঘ ১৩ মাস ইনজুরিতে থাকার পর ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি চুক্তি বাতিল করে নিজের প্রথম ক্লাব সান্তোসে ফিরে আসেন। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে খেলার স্বপ্ন নিয়ে তিনি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত চুক্তি করেছেন।
উপসংহার
নেইমার তার ১৭ বছরের পেশাদার ক্যারিয়ারে মোট ৩২টি ট্রফি জিতেছেন এবং ৬৬৫+ গোল ও অ্যাসিস্ট করেছেন। ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা, দুই মহাদেশের চ্যাম্পিয়ন এবং অলিম্পিক স্বর্ণপদক জয়ী হিসেবে তার অবস্থান ফুটবল ইতিহাসে চিরস্থায়ী। যদিও ফিফা বিশ্বকাপ বা ব্যালন ডি’অর জেতা হয়নি, তবুও তিনি তার প্রজন্মের অন্যতম সেরা এবং সবচেয়ে বিনোদনমূলক খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত। ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের হয়ে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন নিয়ে ৩৪ বছর বয়সেও তিনি ফুটবল খেলে চলেছেন।


